শিক্ষকতার চুয়ান্ন বছর।। পর্ব – ৫৫

তিস্তা এক্সপ্রেসতিস্তা এক্সপ্রেস
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:৫৮ AM, ১৯ মে ২০২১

মাজহারুল মান্ননঃ

[সম্মানীয় পাঠক সাধারণের নিকট আমার অনুরোধ, এই পোস্টে উল্লেখকৃত ব্যক্তিদের সম্পর্কে দয়া করে কেউ কটু মন্তব্য করবেন না।]

(পূর্ব প্রকাশের পর)

টানা সাতাশ মাস একটানা জেল খেটে সিলেট জেল থেকে ছাড়া পেলাম সাতাত্তর সালের মাঝামাঝি। বাড়ি এসে দেখি অভাব অনটনে বিধ্বস্ত সংসার। ছেলেমেয়ে তিনটা অযতেœ বেড়ে উঠছে পাড়াগাঁয়ের স্কুলে। বৃদ্ধা মায়ের ভাঙাচোরা মুখ। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকান যায় না। আমার তখন দিশেহারা অবস্থা।

এমন অবস্থায় একদিন পর কলেজে গেলাম জয়েন করতে। কলেজে গিয়েই শুনি চাকরি নেই। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। প্রিন্সিপাল গিয়াস উদ্দিন স্যারের কাছে যেতেই তিনি বললেন, এতদিন বিনা নোটিশে অনুপস্থিত থেকে চাকরি ফিরে পাবার আশা করো কীভাবে?

তার কথা শুনে আমার মন ভেঙে গেল। একবার মনে হলো স্যারের মুখের ওপর আমাকে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেই। কিন্তু পারলাম না। পারলাম না কারণ এসব শুনে স্যার হয়তো আমার প্রতি আরও বিরূপ হবেন। আর সেটা আমি চাইনি।

আমি স্যারকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। বললাম, স্যার পলাশবাড়ি কলেজের কেমিস্ট্রির শিক্ষক আবদুস সালামও তো আমার সাথেই জেলে ছিলেন। তার তো চাকরি ফিরে পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। উল্টা তিনি সব বকেয়া বেতনও পেয়েছেন।
স্যার আরও গম্ভীর হলেন। বললেন, সেটা তাদের ব্যাপার।

এই দুই আড়াই বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে কলেজের। গিয়াস উদ্দিন স্যার ছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। এখন তিনি পূর্ণাঙ্গ। কলেজে এসেছে অনেক নতুন ছেলেমেয়ে। আমার গা ঘেষে যাচ্ছে তারা। সালাম আদাব দিচ্ছে না। বুঝলাম এরা আমাকে চেনে না। দেখলাম কয়জন নতুন শিক্ষক। এদের অনেককেই আগে থেকেই আমি চিনি। আমাকে দেখে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। কেউ কেউ আবার জেলের অভিজ্ঞতা শুনতে চাইলেন।

পুরাতন অনেক ছাত্র এসে ঘিরে ধরলো আমাকে। তারা আমাকে পেয়ে স্পষ্টতই খুব খুশি। একবার ভাবলাম আমি যে চাকরি ফিরে পাচ্ছি না সে কথাটা এদের বলি। আবার ভাবলাম সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। এ নিয়ে আবার যদি ছেলেরা হই চই শুরু করে। তখন হয়তো প্রিন্সিপাল স্যার পরিস্থিতির জন্য আমাকেই দায়ী করবেন।

নতুন শিক্ষকদের কারো কারো কথার ধরণ দেখে বুঝলাম আমার যে চাকরি নেই সেটা তারা জানেন। এদের নিয়ে একসময় প্রিন্সিপাল স্যার একটা চক্র গড়ে তোলেন। এদের কাউকে কাউকে স্যার চাকরি দিয়েছেন অনিয়ম করে। তারা সব সময় ঘিরে থাকতেন স্যারকে। স্যারও তাদের নানাভাবে সুযোগ সুবিধা করে দিতেন। এরাই একসময় আমার চাকরি ক্ষেত্রে নানা বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি করেছেন। আমার পারিবারিক সঙ্কটকালে বার বার আমাকে বদলি করিয়েছেন। বলতে গেলে আমার জীবনটাই তছনছ হয়ে গেছে সে সময়।

আমার সরাসরি শিক্ষক গিয়াস উদ্দিন স্যারকে আমি কোনোদিন সামন্যতম অশ্রদ্ধা করিনি, এমন কি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জানাজার নামাজে দাঁড়িয়ে সহকর্মীদের পক্ষে একমাত্র বক্তা আমি শিক্ষক হিসেবে স্যারের প্রশংসা করেছি, আল্লাহ্পাকের কাছে স্যারকে বেহেশতবাসী করার জন্য প্রার্থনা জানিয়েছি। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তাঁর অনুগ্রহভাজন শিক্ষকদের কেউ কেউ একসময় সামান্য স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ায় তাঁকে অসম্মান অপদস্থ করতে ছাড়েনি।

যাহোক একবুক হতাশা নিয়ে সেদিনের মতো আমি বাড়ি ফিরে এলাম। নাজমা সংবাদটা শুনে স্তব্ধ হয়ে থাকলো। ছেলেমেয়েরা কী মনে করে যে যার মতো চুপচাপ ঘরে গিয়ে বসে থাকলো। শুধু মা কথা বললেন। বললেন, অতো ভাবনা করিও না তো বাপ। আল্লাহ্ আছে মাথার উপর। তাঁই স’গ দেকপে।

প্রত্যেক দিন আমি কলেজে আসি। সারাদিন অপেক্ষা করে শুকনো মুখে বাড়ি ফিরে যাই। এর মধ্যে একদিন রমজান স্যার, লাবীব স্যার, রাজ্জাক ম-ল, আমজাদ সাহেব (টাইগার আমজাদ), আয়তুল হক সাহেব, এ আর ডাকুয়া, মওলানা ফজলুল হক, মাহফুজুর রহমানসহ আমার প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক সিনিয়র সহকর্মী গেলেন প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে। তাঁদের সাথে আমি যেতে চাইলাম। রমজান স্যার বারণ করলেন। বললেন, তোমার যাওয়ার দরকার নেই।

অনেক্ষণ পর তাঁরা ফিরে এলেন বিফল মনোরথ হয়ে। ওয়াদুদ চৌধুরী বললেন, মান্নান সাহেব বরং কোর্টেই যাক।
আয়তুল হক সাহেব খুব ধীর স্থির মানুষ। তিনি বললেন, না না তার দরকার হবে না। আমরা গভর্নিং বডির সদস্যদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করে দেখি।

এর মধ্যেই ছাত্রদের একটি দল প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করলো। ছাত্রদের চাপ উপেক্ষা করতে পারলেন না স্যার। তিনি একরূপ বাধ্য হয়ে গভর্নিং বডির সভা ডাকলেন। গভর্নিং বডিতে তখন বাইরের সদস্য ছিলেন গোডাউন রোডের অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন আকন্দ, চৌধুরী মিলের মালিক সহহুরুল হুদা চৌধুরী, আর আকবর হালিম বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিক আকবর আলী। চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন এসডিও এহিয়া মোল্লা। তিনি ছিলেন রাজশাহীর মানুষ। মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই ভালো। শিক্ষক প্রতিনিধি যে কে ছিলেন মনে পড়ছে না।

অ্যাডভোকেট আমজাদ আকন্দ ছাড়া অন্যরা প্রিন্সিপাল স্যারের কথারই প্রতিধ্বনি করে বললেন, এতদিন জেল খাটার পর তার চাকরি থাকে কীভাবে? একজন তো বলেই বসলেন, চুয়াত্তরে লঙ্গরখানা খোলার নাম করে একদল ছাত্র নিয়ে তিনি তো প্রকাশ্যে ডাকাতি করেছেন শহরে। সে কথা কে না জানে। তার মতো একজন সন্ত্রাসীকে কলেজে পড়াতে দেওয়াই উচিৎ নয়।

সেদিনই আমার চাকরি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অন্য একটা ঘটনা ঘটলো। ঠিক ওই সময় এসডিওর চেম্বারের ভেতরেই একটা বেতের ইজি চেয়ারে আধাশোয়া অবস্থায় বসেছিলেন গাইবান্ধার বিশিষ্ট রাজনীতিক খন্দকার আজিজুর রহমান। তখন সম্ভবত তিনি ছিলেন গাইবান্ধা পৌরসভার চেযারম্যান। তার দুই আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট। হাত মুঠি করে শব্দ করে টানছিলেন। এটা ছিলো তার স্টাইল। তিনি ছিলেন আনডন্টেড মানুষ। সবাইকে তুমি বলে সম্বোধন করতেন।

প্রিন্সিপাল স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, গিয়াস, কাজটা তোমরা ঠিক করছো না। যতদূর জানি সে ভালো শিক্ষক। আমার ছেলেমেয়েরা তো তার রীতিমতো ভক্ত। শুনেছি তার আর্থিক আবস্থাও ভালো নয়। কী এমন ক্ষতি হয় চাকরিটা ফিরে দিলে?
প্রিন্সিপাল স্যার কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন। অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন তাঁকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, আমরা কি এর আগে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছি। তার অনুপস্থিত কালে তাকে কি কোনো নোটিশ দিয়েছি। না দেইনি। তাহলে তার চাকরি গেল কীভাবে? বড় কথা সে তো জেলে ছিলো ডেটিন্যু। কোনো কনভিকশনও হয়নি তার। এখন সে যদি আমাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোর্টে গিয়ে দাঁড়ায়, আমি নিশ্চিত, সে সকল এরিয়ারসহ চাকরি ফিরে পাবে। তারচে’ বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করে তাকে চাকরিতে বহাল রাখাই বেটার।

সভা শেষে আমি গেলাম জোহা ভাইয়ের কাছে। ব্রিজ রোডের জোহা ভাই ছিলেন এসডিওর সিএ। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা ছিলো আমার ছাত্রছাত্রী। তাঁর কাছেই শুনলাম সভার সব কথা।

বিকেলে বাড়িতে গিয়ে মাকে বলতেই তিনি বললেন, আলহামদু লিল্লাহ।
বললাম, মা, কোর্টে কেস করলে আমি আমার এতদিনের বেতনও পাবো।
মা তড়িঘড়ি করে বললেন, না না তুঁই তো ছ’লপ’ল পড়া’স নাই, ট্যাকাপ’সা নিবু ক্যা? খাটাখাটনি না করি ট্যাকাপ’সা নিলে সেটা যে হারাম হ’বে বাবা।
মা চলে গেছেন অনেক আগে। এখনও তার সেই কথা কানে বাজে, খাটাখাটনি না করি ট্যাকাপ’সা নিলে সেটা যে হারাম হ’বে বাবা।

(চলবে …)

আপনার মতামত লিখুন :